কিভাবে যাবেন? কোথায় থাকবেন?
ঢাকার মহাখালী এবং সায়েদাবাদ থেকে সিলেটের উদ্দেশ্যে বাস ছেড়ে যায় প্রতিদিন। ট্রেনেও যেতে পারেন। ঢাকা থেকে রাতে রওয়ানা দিলে ভাল হয়। সকাল থেকেই ঘুরাঘুরি শুরু করতে পারবেন।যারা উত্তরবঙ্গ থেকে যাবেন তারা ঢাকা হয়েও যেতে পারেন। আবার ময়মনসিংহ হয়েও যেতে পারেন। যদি যমুনা সেতু পার হতে ভোর হয়ে যায় বা ভোর ৪.০০/৪.৩০ বাজে তাহলে সেতু পার হয়ে ময়মনসিংহ রোডে নেমে যাবেন। ঢাকার জ্যাম আপনাকে পাবে না। তবে ভাল মানের গাড়ি না থাকায় সময় একটু বেশি লাগবে। ময়মনসিংহ রোড থেকে ময়মনসিংহ শহর এবং ময়মনসিংহ থেকে সরাসরি সিলেটের গাড়ি পাওয়া যায়। অামরা অবশ্য ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ায় একদিনের জন্য যাত্রা বিরতি দেই।
সিলেট শহরে থাকার মত অনেক আবাসিক হোটেল রয়েছে। কদমতলি বাসস্টান, দরগাহ রোড, জাফলং রোড আরও অনেক জায়গায়। দরগাহ রোডে ভাড়া একটু বেশি। কম ভাড়ায় থাকতে চাইলে বন্দর বাজারে থাকতে পারেন। ঘুরার জন্য এখান থেকে যেকোনো জায়গায় খুব সহজে যেতে পারবেন।
২৭/০৪/২০১৮
২৮/০৪/২০১৮
হযরত শাহজালাল (রঃ) এর মাজারঃ
হযরত শাহজালাল (র.) ছিলেন উপমহাদেশের একজন বিখ্যাত দরবেশ ও পীর। সিলেট অঞ্চলে তার মাধ্যমেই ইসলামের প্রসার ঘটে। ১৩০৩ সালে তিনি ইয়েমেন থেকে সিলেটে আসেন।শহরের মাঝেই ছোট একটি টিলার উপর তার মাজার অবস্থিত। মাজারের কাছেই একটি পুকুরে রয়েছে বড় বড় গজার মাছ। মাজার প্রান্তরে দেখা যায় অনেক কবুতর যা কেউ বধ করে না। কবুতরগুলো জালালী কবুতর নামে পরিচিত।
আমার খুব আকর্ষন ছিল মাজারে কি হয় তা দেখা। সিলেটে পৌঁছতে প্রায় সন্ধা হওয়ায় সন্ধার পর আমরা সেখানে যাই। মাজারে কাউকে সিজদা দিতে দেখিনি। তবে অনেক মোমবাতি জ্বালানো ছিল। যা প্রতিদিনই জ্বালানো হয়। এত আলো থাকতে মোমবাতি জ্বালানোর কি প্রয়োজন? এটা কিসের প্রতীক?
মাজারে শিশু ও মেয়েদের যাওয়া নিষেধ। ছোট বাচ্চা নিয়ে গেলে হাটিয়ে নিয়ে যেতে হবে। আমার ১৫ মাস বয়সী ছেলেকে কোলে নিয়ে যেতে দেয়নি। আমার ছেলেও আমার সাথে হেটে গিয়ে দেখে আসে।
“মেয়েদের মাজারে যাওয়া নিষেধ কেন?” আমার মিসেস এর এমন প্রশ্নের উত্তরে মাজারের একজন খাদেম জানালেন, “শাহ জালাল (র) তার সামনে মেয়ে মানুষ আসা পছন্দ করতেন না। একজন মহিলা তার কবর যিয়ারত করতে চাইলে খাদেমরা নিষেধ করে। এই কথা শুনার সাথে সাথে মহিলাটি ধুপ করে পরে মরে যায়! সেই থেকে উক্তো জায়গার নাম হয় “বিবি গায়রত”।”
হযরত শাহপরাণ (র.) মাজার শরীফঃ
তাপসকুল শিরোমণি হযরত শাহ্পরাণ (র.) শায়িত আছেন সিলেটের খাদিম পাড়ায়। সিলেট শহরের প্রায় ৮ কি. মি. পূর্ব দিকে সিলেট-তামাবিল সড়ক থেকে প্রায় ০.৩ কি. মি. ভিতরে সু-উচ্চ ও মনোরম টিলায় অবস্থিত হযরত শাহ্পরাণ (র.)-এর মসজিদ ও দরগাহ্। মসজিদের পূর্ব দিকে রয়েছে সমাধিটি। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত হতে মাজার জিয়ারত করার জন্য পূণ্যময় সিলেট ভ্রমণে আসেন।এখানেও মাজারে কাউকে সিজদা দিতে দেখিনি। তবে কিছু মানুষ দেখলাম যারা মাজারের সাথে হাত লাগিয়ে খুব কান্না কিযে চাচ্ছে বাবার কাছে সেটা বাবা নিজেও জানে না! কিছু মানুষ পূণ্যের অাশায় মাজারের ধুলাবালি হাতে মেখে বুক ও মুখে মেখে নিচ্ছে।
অনেকে মাজার থেকে পিছন দিকে হেটে সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসছে!
২৮/০৪/২০১৮
২৯/০৪/২০১৮
জাফলং
বাংলার ভূস্বর্গ ও প্রকৃতি কন্যা হিসেবে পরিচিত সিলেটের জাফলং। খাসিয়া জৈন্তা পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত জাফলং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপরুপ লীলাভূমি। পিয়াইন নদীর তীরে স্তরে স্তরে বিছানো পাথরের স্তূপ জাফলংকে করেছে আকর্ষণীয়। সীমান্তের ওপারে ইনডিয়ান পাহাড় টিলা, ডাউকি পাহাড় থেকে অবিরামধারায় প্রবাহমান জলপ্রপাত, ঝুলন্ত ডাউকি ব্রীজ, পিয়াইন নদীর স্বচ্ছ হিমেল পানি, উঁচু পাহাড়ে গহিন অরণ্য ও শুনশান নিরবতার কারণে এলাকাটি পর্যটকদের দারুণভাবে মোহাবিষ্ট করে।ভ্রমনপিয়াসীদের কাছে জাফলং এর আকর্ষণই যেন আলাদা। সিলেট ভ্রমনে এসে জাফলং নাগেলে ভ্রমনই যেন অপূর্ণ থেকে যায়। সিলেট নগরী থেকে ৬২ কিলোমিটার উত্তর পূর্ব দিকে গোয়াইনঘাট উপজেলায় জাফলং এর অবস্থান। জাফলংয়ে শীত ও বর্ষা মওসুমের সৌন্দর্যের রুপ ভিন্ন। বর্ষায় জাফলংএর রুপ লাবণ্য যেন ভিন্ন মাত্রায় ফুটে উঠে। খাসিয়া পাহাড়ের সবুজাভ চূড়ায় তুলার মত মেঘরাজির বিচরণ এবং যখন-তখন অঝোর ধারায় বৃষ্টি পাহাড়ি পথ হয়ে উঠে বিপদ সংকুল-সে যেন এক ভিন্ন শিহরণ। সেই সঙ্গে কয়েক হাজারফুট উপর থেকে নেমে আসা সফেদ ঝর্ণাধারার দৃশ্য যে কারোরই নয়ন জুড়ায়।
সিলেট থেকে জাফলং আসতে অনেক দুর থেকে চোখে পরে খাসিয়া - জৈন্তিয়া পাহাড়। যতই জাফলং এর কাছে আসা যায় ততই পাহাড়গুলি স্পষ্ট হয়। মনের মধ্যে কৌতূহল জাগে। ভ্রমণের স্বার্থকতা খুজে পাওয়া যায়।
আমরা তামাবিল স্থল বন্দর পার হয়েই গাড়ি থেকে নেমে যাই। ওপাশে ইন্ডিয়ান পাহাড়, এপাশে ফাঁকা জায়গা ও পাথরের মাঠ। সুন্দর মনোরম পরিবেশ। দেখতে দেখতেই বৃষ্টি ঝরা শুরু হল। ব্যাগ থেকে ছাতা বের করে আপাতত আশ্রয় নেই। এরপর একটি ঘরে কিছুক্ষণের জন্য আশ্রয় নেই। বৃষ্টি কমলে আবার আমরা বেরিয়ে পরি। পাহাড়ের দৃশ্য দেখতে দেখতে সামনে এগুতে থাকি। বৃষ্টি আবার শুরু হল। এবারের বৃষ্টি cats & dogs. আমরা আশ্রয় নিলাম “ জাফলং ভিউ” রেস্টুরেন্টে। সময় ১২.০০ দুপুরের খাবার এখানেই খেয়ে নেই। বৃষ্টি থামলে আবার রওয়ানা দেই জিরো পয়েন্টের দিকে।
জিরো পয়েন্ট ও খাসিয়া পল্লীঃ
জাফলং এর সবচেয়ে আকর্ষনীয় জায়গা হল জিরো পয়েন্ট। এখানে খুব কাছে থেকে দেখা যায় খাসিয়া জৈন্তিয়া পাহাড়। স্বচ্ছ পানির এবং পাথর বিছানো নদী পার হয়ে ভারত সিমান্তে পাহাড় গায়ে হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখতে পারেন। পাহাড়ের গায়ে হেলান দিয়ে ছবি উঠাতে পারেন। বড় বড় পাথরের উপর উঠে এভারেষ্ট জয় করতে পারবেন। আরও পারবেন বড় পাথরের আড়ালে গিয়ে গুহার ভিতর প্রবেশ করে ছবি উঠাতে।এই জিরো পয়েন্ট থেকে দেখা যায় দুই পাহাড়ের সংযোগ স্থাপনকারী ঝুলন্ত ব্রিজ যার নিচ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে স্বচ্ছ পানির নদী। পানির নিচে দেখা যায় মুক্তার মত বিছানো সাদা পাথর। অনেকেই কক্সবাজারের সী বিচ মনে পানিতে নেমে শরীর ভিজিয়ে নিচ্ছে। ফটোগ্রাফাররা ঘুরাঘুরি করছে ছবি তুলার জন্য। ভারতীয়রাও ঘুরতে এসেছে এখানে।
উপরের দিকে তাকালে দেখা যায় পাহাড় কেটে তৈরী সুন্দর শহর এবং পাহাড় কেটে তৈরী সুন্দর রাস্তা এবং রাস্তায় দাড়ানো শত শত সাদা সাদা কার- মাইক্রো।
খাসিয়া পল্লীঃ
জাফলং এ গিয়ে খাসিয়া পল্লী না গেলে ভ্রমণ অপূর্ণই থেকে যায়। নদী পার হয়েই খাসিয়া পল্লী। খাসিয়া পল্লীতে রয়েছে চা বাগান, খাসিয়া রাজার বাড়ি, সুপারি গাছে লাগানো পানের বাগান ও ঝর্ণা। পানি না থাকায় আমরা ঝর্ণা দেখতে পারিনি। রবিবার হওয়ায় রাজার বাড়িও ছিল বন্ধ। এরপর নদী পার হয়ে আমরা রওয়ানা দেই শহরের দিকে।২৯/০৪/২০১৮
সখের চা সাত রঙ্গের চাঃ
সাত রং বা লেয়ারের চায়ের খ্যাতি দেশজুড়ে। এ বিশেষ ধরনের চা পান করতে অনেকেই চলে যান সিলেটের শ্রীমঙ্গলে। এই চা শুধু শ্রীমঙ্গল নয়, সিলেট শহরে এবং ঢাকা শহরেও পাওয়া যায়। শাহ পরাণ মাজার রোডে পাবেন বিশেষ ধরনের এই চা। একটি স্বচ্ছ কাচের গ্লাসে সাত রঙের সাত স্বাদের চা। প্রতিটি কালার ভিন্ন। একটি অপরটির সঙ্গে মিশে না। প্রতিটি কালারের স্বাদও আলাদা। চামচ দিয়ে না ঘুটে যতই নাড়াচাড়া করুন এক স্তর আরেক স্তরে মিশবে না। অন্যরকম মজা তাই না!তবে খেয়াল রাখবেন প্রতি কাপ চায়ের মূল্য মাত্র ৭০/- আর স্বাদ পাবেন চায়ের চেয়ে জুসের / শরবতের বেশি।
তবুও সখের চা সাত রঙ্গের চা বলে কথা!
সিলেট থেকে ঘুরে আসবেন আর সাত রঙ্গের চা খাবেন না, তা কি হতে পারে?
২৯/০৪/২০১৮
একটি দুর্ঘটনা ও প্রত্যাবর্তনঃ
কষ্ট ভ্রমণের অংশ। প্রতিদিন গড়ে ৮-১০ ঘন্টা গাড়ীতে কাটাতে হয়েছে। এর মধ্যে ঘটে একটি দুর্ঘটনা। অামরা জাফলং থেকে শাহ পরাণ রঃ এর মাজার হয়ে সিলেট শহরে ঢুকি সন্ধা ৭.০০ টার দিকে। সিলেট ওসমানী শিশু উদ্যানে প্রবেশ করি। প্রবেশ মূল্য মাত্র ৩০ টাকা জনপ্রতি। যারা শহুরে পরিবেশে বিরক্ত তারা ছেলে মেয়ে নিয়ে সময় কাটাতে পারেন। অল্প স্পেস। সরকারি প্রতিষ্ঠান হওয়ার পরও প্রবেশ মূল্য ৩০ টাকা আমার কাছে বেশি মনে হয়েছে।এর মধ্যে মানি ব্যাগ ও ফাঁকা হয়েছে। অনেক খুজাখুজি করে এ টি এম বুথ থেকে টাকা উঠিয়ে হোটেলে গিয়ে ভাত খেয়ে থাকার হোটেলে উঠি রাত প্রায় ৯.০০ টায়।
রুমে ঢুকে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেই। রাইয়ান নিজের মত করে খেলছে। আমরা এশার নামাজের প্রস্তুতি নিচ্ছি। আমি ওযু করে আসার পর আমার মিসেস ওযু করার জন্য বাথরুমে ঢুকেছে মাত্র। রাইয়ান বেড থেকে টেবিলে উঠতে গিয়ে পা পিছলে পরে যায়। আমার কাছে থেকেও ধরার সুযোগ পাইনি। সাথে সাথে মুখ দিয়ে রক্তক্ষরণ শুরু হয়। সাথে সাথে বেসিনে পানি দিয়ে রক্ত বন্ধের ব্যর্থ চেষ্টা করি। ওকে নিয়ে বাইরে এসে হোটেল দেখাশুনাকারীদের বললাম, “ভাই, বাবুর এই অবস্থা, ডাক্তার কোথায়?” তারা আমাকে পরামর্শ দিল সরাসরি ওসমানী মেডিকেলে নিয়ে যাওয়ার জন্য। তারা সি এন জি ভাড়া করে দেয়। রাস্তা আর শেষ হয়না। আধা ঘন্টা রক্তক্ষরণ হয়। আমরা দুজনে খুব ভয় পাই। মেডিকেলে পৌঁছানোর আগেই রক্ত বন্ধ হয়।
সরকারি মেডিকেলে রোগী ভর্তি করতে যত ঝামেলা পোহাতে হয় এর মধ্যে রোগীর অবস্থা আরও শোচনীয় হয়। জরুরি বিভাগে নিয়ে গেলাম সেখানে একটা চিরকুট ধরিয়ে অার এক জায়গায় পাঠালো, ওখানে বাবুকে দেখে পাঠালেন চতুর্থ তলায়, সেখানে গিয়ে দেখি ডাক্তার নেই। তারপর পাঠানো হল পঞ্চম তলায়, সেখানে ডাক্তার দেখে ওষধ ও ইন্জেকশন লিখে দিলেন বাইরে থেকে নিয়ে আসার জন্য। ওষধ ও নিয়ে অাসার পর নার্স ইন্জেকশন পুশ করিয়ে দেয়। তারপর ডাক্তার রুমে যেয়ে দেখি রাত ১০.০০ টা বাজায় ডাক্তার চলে গেছেন। তারপর আর কি করার। বাবুকে নিয়ে রুমে ফিরে আসি।
পরের দিন মাধবকুণ্ড যাওয়ার প্লান ছিল। কিন্তু কি আর করার, মন ভাল নেই,বাবু অসুস্থ। ফিরে আসলাম সিলেট থেকে।
২৯/০৪/২০১৮
৩০/০৪/২০১৭
২৯/০৪/২০১৮
৩০/০৪/২০১৭
লিখেছেনঃ এস জামান হুসাইন


0 মন্তব্যসমূহ