হঠাৎ সাদামাঠা একটা ভ্রমনের গল্প

Suvolong tour

গল্পের শুরুটা কোনো এক শীতের সকালে, কিছু ট্যুর পাগলা গরীব ছেলেপুলের হঠাৎ একটা প্ল্যান!

গন্তব্য শুভলং ঝর্না,রাঙ্গামাটি।
যেহেতু চট্টগ্রামের সন্তান তাই পূর্বপ্রস্তুতির তেমন প্রয়োজন পড়েনি, একটা মাইক্রো ঠিক করে রওনা দিলাম।
সকালটা ছিলো ঘন কুয়াশায় ঘেরা, ভোর ৬ টায় সবাই ব্যাকপ্যাক,গামছা, সানগ্লাস আর সেলফি স্টিক নিয়ে হাজির!
যদিও শীত তাও উত্তজনায় শীতকে তোয়াক্কা না করে সোয়েটার পরেনি কেউ!
বাসা থেকে ডিম সিদ্ধ,কলা আর পাউরুটি নিয়ে কাকডাকা ভোরে যাত্রা শুরু রাঙ্গামাটির উদ্দেশ্যে কারনরন দিনে দিনে শুভলং ঘুরে আসতে গেলে ভোরে রওনা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।
গাড়ী চললো পাহাড়ী আঁকাবাঁকা পথে বাংলা মায়ের সবুজ ক্যানভাসের ভেতর দিয়ে।কুয়াশা ভেদ করে সোনালী রোদ্দুর,গ্রামের ছোট্ট বাজার, আদীবাসি এলাকা,পাহাড়ী লোকজন আর ছিমছাম ছবির মতো রাস্তায় কখন যে হারিয়ে গেলাম নিজেও জানিনা।
সকাল ৯ টার ভেতর পৌছে গেলাম রাঙ্গামাটি সদরে,সেখান থেকে রিজার্ভ বাজারে।
যেখানে সারি সারি সাজানো ইন্জিনচালিত বোট ও স্টিমার।আদিবাসী লোকজন দুরের লংগদু, বিলাইছড়ির পানে যাওয়ার তাড়ায় লোকাল স্টিমারে উঠতে ব্যাস্ত।
শুভলং এ যাওয়ার সবচে ভালো উপায় হলো ১০/১২ জনের ইন্জিনচালিত বোট রিজার্ভ করা ফেলা।
ভাড়া ১৫০০-২০০০ এর মধ্যে পুরো দিন।
আমরা তেমনি একটি বোটে চেপে কাপ্তাই লেকের নিস্তরঙ্গ জলরাশী ভেঙ্গে ভোরের কুয়াশা মাখা আলো ঝলমলে রোদে রওনা দিলাম।
আশেপাশে ছোট বড়ো টিলা আর কাপ্তাই লেকের গাঢ় নীল জলরাশী আর মাঝে মাঝে পাশ কাটানো আদীবাসী জেলেদের হাতে টানা নৌকা আর স্টিমার।
পানি ছিলো স্ফটিকস্বচ্ছ আর বরফশীতল।
চারপাশের জল এতো নীল হারিয়ে দিলো এক অন্য ভূবনে।
বিশ্বাস করুন তখন আপনার ও মনে হবে আহা! এ পথ যদি শেষ না হতো! যদি কাপ্তাই লেকের এ জলেই যদি জীবনটা কেটে যেতো!
যাত্রাপথে আপনাকে অভিবাদন জানাবে বিশাল বুদ্ধমূর্তি আর বানরের দল।
যাদের পাহাড় প্রীতি রয়েছে তারা বরকল নামতে পারেন।
আমরাও নেমেছি তবে শেষ করতে পারিনি,দুবেলা ভাত খেলে যা হয় আরকি!
আমাদের তাজিনডং,কেউক্রাডং জয় করা একজন অভিযাত্রীও রীতিমতো ধরাশায়ী হলেন প্রচন্ড রোদে!
যাত্রাপথে পড়বে চাংপাং, পেদাটিং টিং এর মতো রেস্টুরেন্ট দ্বীপ যেখানে ইচ্ছেমতো উদরপূর্তির ব্যাবস্হা রয়েছে, টিকটাকমতো অর্ডার করতে পারলে বাজেটের মধ্যেই লাঞ্চ করা সম্ভব।
আমরা চাংপাংয়ে খাবার অর্ডার করে চলে গেলাম সোজা শুভলং বাজারে,
দুপুর দেড়টা নাগাদ শুভলং বাজারেরে নামলাম,সেখানে বাজার দেখতে দেখতে আর পাহাড়ী ইক্ষু খেতে খেতে আমরা শেষপ্রান্তে চারিদিকে লেক বিশিষ্ট মাজারে চলে গেলাম।
আহা! কি নয়নাভিরাম সে স্হান!এককোনে মাজার আর তার চারিদিকে জল।আর মাজারের কলসিতে রাখা ভীষন শীতল জল! প্রান জুড়িয়ে যায়।
তারপর শুভলং বাজারের আর্মি স্টোরের রসগোল্লা এবং স্যুভেনিরের দোকানগুলোতে কেনাকাটা সেরে ফেললাম তাড়াহুড়া করে!
শুভলং বাজারের পাশেই বিশাল পাহাড়ে রয়েছে খাঁজকাটা সিড়ি,সিড়ি বেয়েয়ে মাঝপথে নিচের দিকে তাকালে মনে হবে আপনি কাপ্তাই লেকের নীলাভ জলে ভেসে রয়েছেন! স্বর্গের সোপানে দাড়ানোর অনুভুতি হবে নিশ্চিতভাবে!
আর চারপাশের সবুজের আলিঙ্গন তো রয়েছে।
এরপর চলে গেলাম কাঙ্খিত শুভলং ঝর্ণায়, যদিও পানি তেমন ছিলনা তবে ঝর্ণা দেখলেই অনুমান করা যায় ভরা বর্ষার কি ভয়ংকর হবে তার রুপ!
সে বিশাল! যেনো এক দানব শীতনিদ্রায় মগ্ন!
৩০ টাকা টোকেন মাটি করে আবার রওনা দিলাম এবং পাহাড়ের আড়ালে লুকোনো আরেকটি ঝর্ণায় পানি পেলাম এবং শরীরের জ্বালা জুড়োলোম।
তবে এই ঝর্ণাটাও অনেক বড়ো ছিলো এবং যথেস্ট পানিও ছিলো।
এরপর গোসল সেরে সোজা চলে গেলাম চাংপাং রেস্টুরেন্টে আনুমানিক ৪ টায়। পাতলা ডাল,সাদা ভাত,বাশ মুরগী আর সবজী দিয়ে গোগ্রাসে গিললাম কয়েকজন ক্ষুদার্ত যাযাবর!
ভাতের পরে উপরের টংয়ে পাহাড়ী লাল চা।
আর অনেকে তেতুল সত্তা পেয়ে ব্যাগ ভরে ফেললো!
অতঃপর ফিরে আসা….
কাপ্তাইয়ের জল তখন হালকা সবুজ!
শেষ বিকালের রোদ সে জলে আচল ভিজিয়ে সোনারং ছড়ায়!
পথে দেখা হয়ে যায় পাহাড়ী কন্যার যে একা বৈঠা বায় সোনার গাংয়ে!জেলেদের জাল ঘুটানোর তাড়া।
মাছধরার নৌকো, বাজার শেষে ঘরে ফেরা নৌকো পেছনে ফেলে কাপ্তাইয়ের বিশাল জলে অস্ত যায় টকটকে লাল সূর্য।
কি অপরুপ সে দৃশ্য তা কোনো কলমে ধরবেনা।
মনে হবে এ লেকেরই কোনো একটকটি দ্বীপে মাঝি হয়ে কাটিয়ে দিই বাকি জীবন!
আধো অন্ধকারে ঝুলন্ত সেতুর নিচ দিয়ে ঘুরে এসে যাত্রা শেষ করলাম।
পেছনে পড়ে থাকে এক স্বর্গের নহর,নির্জন কিছু দ্বীপ,এক অকল্পনীয় অভিজ্ঞতা আর সহজ সরল কিছু মূখ।

লিখেছেনঃ আজমল হাবিব

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ