ভ্রমণের জন্য বাইক অনেকের কাছে বেশ পছন্দের একটি বাহন। কিন্তু সঠিক পরিকল্পনার অনেকেই ধারাবাহিকভাবে ভ্রমণ করতে পারেন না। সে কারণে অনেক চিন্তা ভাবনা করে বানিয়ে নিই ৭ দিনের ভ্রমণ পরিকল্পনা। এই প্ল্যানটি ছিলো এমন ঢাকা–খাগড়াছড়ি–সাজেক–কাপ্তাই–রাঙ্গামাটি–বান্দরবান–কক্সবাজার–ঢাকা। এই ভ্রমণের আয়োজন ও প্রস্তুতিতে ছিল কিছুটা ভিন্নতা।
বাইক ভ্রমণ হওয়ার কারণে অন্যান্য ট্যুরের মত লাগেজ/বড় ব্যাগ নেয়া সম্ভব হয়নি। এক্ষেত্রে, আমরা মোটরসাইকেলে ভ্রমণের জন্য বিশেষ একধরনের ব্যাগ নিয়েছিলাম, সেডেল ব্যাগ। এই ব্যাগ দুইটি অংশে বিভক্ত, যা মোটরসাইকেলের দুই পাশে থাকে এবং ভারসাম্য রক্ষা করে। তাছাড়া, নিরাপত্তার জন্য আমরা দুজনেই হেলমেট, হ্যান্ড গার্ড, লেগ গার্ড এবং হ্যান্ড গ্লাভস ব্যবহার করেছিলাম। তাছাড়া সাথে একটি ছোট ব্যাগ-প্যাক নিয়েছিলাম এবং সাথে কিছু শুকনো খাবার। যেহেতু ট্যুরটি বেশ চ্যালেঞ্জিং ছিল, তাই অনেক ক্ষেত্রেই আমাদের নিয়মানুযায়ি খাওয়া হয়নি।
প্রথম দিন (সাজেক পর্ব)
গতবছরের ০৬ অক্টোবর সকাল ৬টায় মেঘের রাজ্য সাজেকের উদ্দেশ্যে ঢাকা থেকে রওনা করি। দুপুর ১টা নাগাদ চলে যাই খাগড়াছড়ি। সৃষ্টির অপরূপ সৌন্দর্যের নিদর্শন এই খাগড়াছড়িতে রয়েছে আকাশ ও পাহাড়ের মিতালী। খাগড়াছড়িতে দুপুরের খাওয়া সেরে বিশ্রাম নিয়ে, আবার আঁকাবাঁকা পথে রওনা করি সাজেকের উদ্দেশ্যে। এখানে বলে রাখা প্রয়োজন যে, সাজেকে প্রবেশের সময় হল সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৩টা ৩০মিনিট পর্যন্ত। আর তাই এই সময়ের মধ্যে সাজেক পৌঁছানোর জন্য আমরা খুব দ্রুতগতিতে যাই। তারপরও ঘণ্টাখানেক দেরিতে পৌঁছাই। খানিকটা অনুরোধ করার পরে আমরা সাজেকে প্রবেশের অনুমতি পেয়ে যাই।
এরপর শুরু হয়, আঁকাবাকা পাহাড়ি রাস্তা ধরে পথ চলা। পাহাড়ের সেই উঁচুনিচু আঁকাবাকা জনমানব শূন্য এলাকা যেন এক ভয়ঙ্কর সৌন্দর্যের উদাহরণ। এভাবে চলতে চলতে সন্ধ্যা নাগাদ আমরা পৌঁছে যাই সাজেকের মূল অংশে।
পড়তে পারেনঃ বাইক চালানোর কিছু ভূল ধারণা।
আমরা যেই রিসোর্টে উঠেছিলাম, তার নাম হল সুমুই ইকো রিসোর্ট, প্রতি রাতের ভাড়া ৩,৫০০ টাকা। এই রিসোর্টের বিশেষত্ব হল, বারান্দা থেকে মেঘের রাজ্যের অপার সৌন্দর্য উপভোগ করা সম্ভব। তাছাড়া, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা আর সার্ভিসের ক্ষেত্রে এটি অনন্য। সাজেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ নেই! সন্ধ্যায় জেনারেটর চালু হয়, যা রাত ১০টা থেকে ১২টার মধ্যে প্রত্যেকটি রিসোর্টেই বন্ধ হয়ে যায়! তাই জেনারেটর থাকতে থাকতেই মোবাইলসহ প্রয়োজনীয় ডিভাইসে চার্জ দিয়ে রাখতে হয়। রাতে আমরা চিম্বাল রেষ্টুরেন্টে ব্যাম্বো চিকেন দিয়ে ডিনার করি। ব্যাম্বো চিকেন হচ্ছে বাঁশের ভিতরে একটি বিশেষ পদ্ধতিতে রান্না করা মুরগির মাংস। জেনে রাখা প্রয়োজন, সাজেকে খাবার অর্ডার আগেই দিয়ে রাখতে হয়। একটা খাবার অর্ডার করে, পরে খাওয়ার সময় অতিরিক্ত অন্য কিছু খেতে চাইলেও উপায় নেই!
দ্বিতীয় দিন (সাজেক পর্ব)
সুমুই ইকো রিসোর্টের মেঘের রাজ্য দেখে তারপরদিনের যাত্রা শুরু হয়। ঘুম থেকে উঠে মনে হচ্ছিল, ঠিক যেন মেঘের ওপরে ভাসমান কোনো এক রাজ্যে রয়েছি। এরপর সকালে হালকা কিছু নাস্তা সেরে আমরা রওনা করি কংলাক পাহাড়ের দিকে। উঁচু-নিচু পাহাড়ি পথ বেয়ে মোটরসাইকেলে উঠে গেলাম পাহাড়ের ওপর! তবে নির্দিষ্ট একটা পর্যায় পর্যন্ত যাওয়ার পর হেঁটেই উঠতে হয়। কংলাক পাহাড়ের উপরের দিকে যেই গ্রামটি, তার নাম কংলাক পাড়া। ছোট ছোট ঘরে সাজানো এই কংলাক পাড়ায় প্রায় প্রতিটি ঘরের সামনেই রয়েছে নানা রঙের ফুলের বাগান। এরপর এই কংলাক পাড়া পার হয়ে আমরা পৌঁছালাম একেবারে চূড়ায়! সমগ্র সাজেকটাই যেন এক নজরে সেখান থেকে দেখা যাচ্ছে!
দুপুরের রিসোর্টে ফিরে ফ্রেশ হয়ে দুপুরের খাবারের খেলাম। এরপরে বিকেলে সাজেকের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য উপভোগের পালা। সাজেকের জিরো পয়েন্ট থেকে বিকালের সৌন্দর্য ও সূর্যাস্ত উপভোগ করা, সন্ধ্যার পরে চা খাওয়া, গান শোনা ইত্যাদি করেই সময় পার হয়ে গেয়েছিল। এরপর রাতের সৌন্দর্য উপভোগ করার পালা। রাতে তখন দেখলাম খোলা আকাশে তারার সমাহার! সেই সময় যদি আপনার সাথে এমন কেউ থাকে, যিনি তারা চিনেন, কিংবা তারাদের নাম জানেন, তাহলে তো আর কথাই নেই! মহাবিশ্ব আর তারকাদের নিয়ে কিছুক্ষণ গবেষণা করে ফিরে এলাম সুমুইয়ে।


0 মন্তব্যসমূহ